সমান্তরাল

বিখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ বসু সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখলেন যে তাঁর মাথার মধ্যে কেবলই কবিতা গিজগিজ করছে। বিজ্ঞানের নামমাত্র সেখানে নেই, শুধুই কবিতা এবং কবিতা! মনে মনে একের পর এক কবিতা ভেবে চলেছেন, কোনও বিরাম নেই!
রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই মেঘনাদবাবু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিজেকে নিরীক্ষণ করেন। তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যেস। ঐ সময়েই মেঘনাদবাবু মনে মনে তাঁর আগের দিনের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সংক্রান্ত কাজগুলো ঝালিয়ে নেন আর সেই সঙ্গে সারাদিনের পরিকল্পনাও করে নেন। কিন্তু আজকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে দেখতে মেঘনাদবাবু নিজের মনেই বলে উঠলেন,
'খোঁচা খোঁচা চু্ল, গোঁফ যেন ঝাঁটা,
ভুঁড়ি তুলতুল, পেটে আস্ত পাঁঠা।'
আগের দিন রাতে খেতে বসে মেঘনাদবাবু প্রায় কেজি খানেক রেওয়াজি পাঁঠার মাংস উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সকালের কবিতা সেটার কথা তাঁকে মনে করিয়ে দিল। কিন্তু কী আশ্চর্য! অনেক ভেবেও বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন কিছুই তিনি মনে করে উঠতে পারলেন না। খুবই চিন্তায় পড়ে গেলেন তিনি। একজন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী যদি নিজেই বিজ্ঞান ভুলে যান, তাহলে অবাক হওয়ারই কথা।
তাঁর আবছা আবছা মনে আছে, গতকাল রাত্তিরে তিনি ইলেক্ট্রিসিটি নিয়ে কাজ করছিলেন, কিন্তু আজ সকালে অনেক চেষ্টা করেও যেটা তাঁর মাথায় এল তা হল,
'আলো আমার আলো ওগো, আলোয় ভুবন ভরা,
বিদ্যুৎ চুরিও বড় বিদ্যা যদি না পড় ধরা!'
ভারী অস্বস্তি রয়ে গেল তাঁর মনের মধ্যে।

বিখ্যাত ফুটবল কোচ পি কে দত্ত রোজ সকাল পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে ময়দানে দৌড়তে যান। ঘণ্টাখানেক দৌড় আর শরীরচর্চার পর দত্তবাবু তাঁর নিজের ফুটবল কোচিং সেন্টারে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেদের ফুটবল শেখান। দত্তদা (তাঁর ছাত্ররা তাঁকে এই নামেই ডাকে) খুবই নামডাকওয়ালা কোচ। তাঁর কোচিং সেন্টারের অনেক ছাত্রই ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান খেলেছে। আর অন্যান্য ছোটখাট ক্লাবে কজন খেলেছে তার কোনও হিসেব নেই।
কিন্তু আজ কোচিং সেন্টারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে দত্তদার হঠাৎ কোমর দুলিয়ে নাচতে ইচ্ছে করল। এমনকী সেখানে গিয়েও দত্তদার মনে হল ফুটবল খেলার বদলে নাচ শেখানো অনেক সহজ কাজ।
পাসিং, ড্রিবলিং, হেডিং না শিখিয়ে দত্তদার খুব ইচ্ছে হল সালসা, ট্যাঙ্গো, ফক্সট্রট, রায়বেঁশে, ভারতনাট্যম বা মণিপুরী নাচের ক্লাস নিতে। যদিও দুটোতেই ফুটওয়ার্কের প্রয়োজন, কিন্তু দুটো যে এক নয় সেটা তিনি বুঝতে পারছিলেন। তাই দত্তদা ক্লাস নেওয়ার বদলে ছেলেদের দুটো দল করে প্র্যাক্টিস ম্যাচ খেলতে বললেন।
ছেলেদের দুটো দলে ভাগ করে ম্যাচ খেলতে শুরু করল আর দত্তদা মন দিয়ে ছোলাভাজা চিবোতে চিবোতে ভাবতে বসলেন সকাল থেকে কী হয়ে চলেছে। হঠাৎ গোবিন্দ চারটে ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বাঁ পায়ে গোলার মতো শটে ফুটবলটা গোলে পাঠিয়ে দেওয়ার পর উচ্ছ্বসিত হয়ে হাততালি দিতে দিতে এগিয়ে এসে বললেন, “সাব্বাস, পুরো মারাদোনার মতো গোল!”
কিন্তু তাঁর মুখ দিয়ে বেরোল, “সাব্বাস, পুরো মাইকেল জ্যাকসনের মতো নাচ!”
তাঁর এই অভিনন্দন শুনে মাঠ ভর্তি ছেলে কেমন ভেবলে গেল। গোবিন্দ গোল করার আনন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল, দত্তদার কথা শুনে ঘাবড়ে গিয়ে উল্টে পড়ে গেল। বাকিরা যে যেখানে ছিল, সেখানেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু খেলোয়াড়দের চেয়েও বেশি অবাক হলেন দত্তদা। এসব কথার কোনও মাথামুন্ডুই তো নেই! চটপট মাঠ ছেড়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন তিনি।
ভারী অস্বস্তি রয়ে গেল তাঁর মনের মধ্যে।


ষাটের দশকের বিখ্যাত নায়ক বিশ্বকুমারের সমস্যাটা হল অন্য। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বিশ্বকুমারের মনে হল যেন তাঁর মাথার মধ্যে গাদা গাদা মাছ কিলবিল করছে! সে পদ্মার ইলিশই হোক বা চিল্কা হ্রদের চিতল! বিশ্বকুমার অভিজ্ঞ লোক, অনেক ঘাটের জল ও অন্যান্য তরল খেয়ে চুল পাকিয়েছেন। তাই বুড়ো বয়সে এরকম হতেই পারে বলে ব্যাপারটা পাত্তা না দিয়ে চিংড়ি আর চুনো মাছের দাম নিয়ে মনে মনে দরাদরি করতে করতে বিশ্ববাবু স্টুডিও চলে গেলেন। আজকাল তিনি বিভিন্ন বাংলা মেগা সিরিয়ালে দাদু বা ঠাকুর্দার ভূমিকায় অভিনয় করে উপার্জন করে থাকেন।
গণ্ডগোলটা হল অভিনয়ের মধ্যিখানে। বিশ্বকুমার তখন বিখ্যাত বাংলা মেগা 'দধিকর্মা'র শুটিং করছিলেন। সিরিয়ালের নায়িকা রাঙাজবা, বিশ্ববাবু যার দাদুর পার্ট করছেন, বাড়ির রাঁধুনিকে বিয়ে করে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে বিশ্ববাবুকে প্রণাম করতে এসেছে। বিশ্ববাবুর ডায়লগ ছিল, “সাবধানে থেকো। সৌভাগ্যবতী হোয়ো।” কিন্তু সেটার বদলে তিনি বললেন, “মৌরলা মাছ ভেজে খিচুড়ি দিয়ে খেও। শিঙ্গি মাছের দাম দুশ টাকা কেজি।”
রাঙাজবা কান্না ভুলে খিলখিল করে হেসে উঠল। সিরিয়ালের পরিচালক বংশী পাল নিজের চেয়ার থেকে উঠে এসে বলল, “কী হয়েছে দাদু? এনি পব্লেম?
বিশ্বকুমার খিঁচিয়ে উঠে বললেন, “আড়াই কেজির রুইমাছটার আঁশ ছাড়িয়ে ছোট ছোট করে কাট।”
এরপর আর ওখানে থাকা যায় না। বিশ্বকুমার গাড়িতে উঠে বাড়ির দিকে যাত্রা করলেন। এভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। এটা কি বুড়ো বয়সের ভীমরতি, নাকি তিনি পাগল হয়ে যাচ্ছেন!
ভারী অস্বস্তি রয়ে গেল তাঁর মনের মধ্যে।


মহাকাশের একদম শেষ সীমায় একটা ছোট্ট ঘরে লোকটা বসে ছিল। ছোটখাট বেঁটে মতো একটা লোক, মাথার চুল উসকোখুসকো, চোখ দুটো বসে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে কোনও একটা সমস্যা নিয়ে লোকটা প্রচণ্ড চিন্তিত, রাতে ঘুম পর্যন্ত হয়নি। লোকটার নাম বিশ্বাস। তবে পৃথিবী বলে একটা গ্রহের লোকেরা একে অন্য কীসব নামে ডাকে। কেউ বলে ঈশ্বর, কেউ বলে আল্লা, কেউ বলে গড। আর মাঝেমধ্যেই বিশ্বাসকে নিয়ে ঝগড়া, মারামারি করে মরে।
বিশ্বাস নিজের হাতের ট্যাবটা খুব মন দিয়ে দেখছিল আর মাঝে মাঝেই ঘরের একদিকে রাখা সার্ভারের মতো জিনিসটার দিকে তাকাচ্ছিল। সার্ভারটা খুব ছোট নয়, অনেকগুলো অংশ, ছোট-বড় সার্কিট, লাল-হলুদ-সবুজ অনেকগুলো আলো জ্বলছে নিভছে সার্ভারের গায়ে।
আগেই বলেছি বিশ্বাসের মনে শান্তি নেই। গতকাল সূর্য বলে ঐ ক্ষুদে তারায় হওয়া ঝড়টা এত সিরিয়াস হবে বোঝা যায়নি। তবে ঝড়টা হয়েছেও বেশ জোরে। গত পঁচিশ বছরের সবচেয়ে বড় সৌরঝড়। বিশ্বাস মুচকি হাসল। মনে পড়ে গেল তার নিজের পঁচিশ বছর পৃথিবী বলে ঐ গ্রহটায় পঁচিশ হাজার বছর। কিন্তু এই সৌরঝড়ের চক্করে সার্ভার ডাউন হয়ে গিয়ে দুটো প্যারালাল ইউনিভার্সে অদল-বদল হয়ে যেতে পারে এটা বিশ্বাসের আগেই ধরতে পারা উচিত ছিল।
বিশ্বাস ভাবতে লাগল, ট্যাবটাকে একবার রিস্টার্ট করে দেখলে কেমন হয়!

তপোব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়


  • জন্মসালঃ ১৯৮৩

    প্রধানত পাঠক, তাই যে কোনও বই এবং ব্লগ দেখলেই সেটির পেছনে কিছুটা সময় দিতে ইচ্ছে করে। লেখালেখি অনেক দিন থেকেই, তবে মন দিয়ে লেখা গত চার-পাঁচ বছরে। নিজের ব্লগ ছাড়াও অন্যান্য ওয়েবজিন ও বিভিন্ন ক্রিকেট সংক্রান্ত ওয়েবসাইটেও কিছু লেখা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।

    ব্লগের লিঙ্কঃ http://www.therwindow.blogspot.in


মতামত


গল্প প্রতিযোগিতার ফলাফল

ধারাবাহিক উপন্যাস

এগারোজন অশ্বারোহী
:: শামিম আহমেদ

প্রতিযোগিতার গল্প

কমলারঙের ডেইজি
:: কেয়া মুখোপাধ্যায়
ত্রিজ
:: সুব্রত রুজ
বিন্তিমাসি
:: সরিৎ চট্টোপাধ্যায়
তিনপাত্তি
:: জয়তী অধিকারী
বেনিআসহকলা
:: সহেলী রায়
সংক্রমণ
:: অনিরুদ্ধ সেন
চাবি
:: জয়াশিস ঘোষ
বাঘে-মানুষে
:: শংকর সেন
সোহাগ
:: অবিন সেন
দু-চার জনের জীবনচর্যা
:: সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়
একটি অন্যরকম গল্প
:: রঙ্গীত মিত্র
শুভাকাঙ্খী
:: সুমিত রায়
বোমপচা
:: সরোজ দরবার

বড় গল্প

গল্প

অতিরিক্ত যৌনতার দাবিতে
:: সংহিতা মুখোপাধ্যায়
সমান্তরাল
:: তপোব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
অসুখ
:: ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়